Pancha Romoncha পঞ্চ রোমাঞ্চ বই কভার

পঞ্চ-রোমাঞ্চ; দেশের প্রথম এডাল্ট গ্রাফিক নভেল

Blog, Book Reviews , , ,

কাজী আনোয়ার হোসেন এর সাথে পরিচয় সম্ভবত রহস্যপত্রিকা দিয়ে, কারণ মাসুদ রানা প্রথম হাতে নেই ক্লাস ফাইভে মনে হয়, আর রহস্যপত্রিকা ক্লাস থ্রিতে।

এক পরিচিত আপুর বাসায় গুদামের মত করে রাখা ছিল গাদা গাদা রহস্য পত্রিকা, আমি গিয়ে সারাদিন সেখানে পড়ে থাকতাম সময় পেলেই। এক সময় সে দেখল যে এই ছেলে তো তার বাসায় খুঁটি গেড়ে বসছে, আর বেশিদিন হলে নড়ানো যাবে না, তখন থেকে সে পত্রিকা বাসায় নিয়ে যেতে দেয়া শুরু করল।

পঞ্চ রোমাঞ্চ আসলে বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে রহস্যপত্রিকার জন্য লেখা পাঁচটি রোমাঞ্চ-গল্প, এগুলো বিভিন্ন সময় রহস্যপত্রিকায় বের হয়েছে। আমার যেহেতু রোজ দুটা করে রহস্য পত্রিকা খাবার অভ্যাস হয়ে গেল একটা সময়, তাই এই সবগুলো গল্পই পড়ে নিতে বেশি সময় লাগেনি।

ক্লাস থ্রি এর মানুষ, সব হয়ত বুঝি নি, তবে পড়ে মজাটুকু পেতে মনে হয় বয়স জিনিসটা অত বড় ফ্যাক্ট না।

এরপরে ক্লাস এইটে আবার গল্পগুলোর দেখা পাই, এক মলাটে। পঞ্চ-রোমাঞ্চ নামে। আমি তখন ক্লাস ফাকি দিয়ে রোজ রোজ এক বই এর দোকানে অনারারী দোকানদার হিসেবে কাজ করছি, দোকানে বসে মাছি তাড়ানো আর দোকানের সব বই পড়ে ফেলাই ছিল আমার কাজ।

সেই একই পঞ্চ রোমাঞ্চ আবার ফিরে এলো আমার জীবনে, এই বই মেলায়। রুমী ভাই বেশ অনেক দিন থেকেই বলছিলেন যে গ্রাফিক নভেল নিয়ে বাংলাদেশে ইতিহাস ঘটিয়ে দেয়ার মত কিছু একটা করবেন, অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বুড়োই হয়ে যাব কি না ভাবতে ভাবতেই দেখি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন চলে এসেছে ঢাকা কমিক্স এর তরফ থেকে।

কিভাবে কিভাবে যেন একটা বই বিশেষ আকর্ষণসহ আমার হাতেও চলে এলো, আর আমিও আবার ফিরে গেলাম আমার সেই রহস্যপত্রিকা আর অনারারী দোকানদারীর দিনগুলোতে!

হাতে পাবার পরে এক বসায় বইটি শেষ করিনি। উহু! এক দিনে একটা করে গল্প, ধীরে ধীরে রয়ে সয়ে পড়েছি।

সব শেষ করে আজ তাই সেটা নিয়ে লিখতে বসলাম, শুনলাম ঢাকা কমিক্স নাকি রিভিউ লিখলে পরের কমিক্সগুলো দেবে বিশাল কপাল-ওয়ালা মানুষদের! নিজের কপালের আকার ছোট, তাও ভাবলাম একটা চেষ্টা নেয়া যাক।

একটা গ্রাফিক নভেল এর প্রথম এবং প্রধান সক্ষমতা হল এটা এক টানে গল্পের ভেতরে নিয়ে যেতে পারে, যদি সেটা সঠিকভাবে আকা হয়। এই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছেন বইটির সাথে জড়িত শিল্পীগন এ কথা আমি বুক ঠুকে বলতে পারি। একটা গল্পকে কমিকে রূপান্তর আর সেটাকে মুভিতে রূপান্তরের বেসিক প্রসেসটা মোটামুটি একই। আর তাই সেটার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সম্ভাবনাটুকুও ঠিক একই রকম।

বিখ্যাত অনেক উপন্যাস/গল্প যেমন এই ব্যর্থতার কারণে অখাদ্য মুভিতে পরিণত হয়েছে, সেই ভয় নিয়েই বইটা প্রথম খুলি আমি।

কিন্তু না, তারা এখানেও খুব ভালভাবে সফল। রূপান্তরের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় গল্প থেকে খানিক সরে আসতে হয়েছে, সেই বিষয়টাও ঠিকঠাক ভাবে হয়েছে, অন্তত স্মৃতি তাই বলে। পড়তে গিয়ে কোথাও খাপছাড়া লাগেনি।

তবে আরও যে জিনিসটা নজরে এসেছে, অন্তত তিন চার জায়গায় বানান ভুল হয়েছে, এক দু জায়গায় শব্দই গায়েব হয়ে গেছে। একটা গ্রাফিক নভেল এর পেছনে অনেক মানুষের শত শত ঘণ্টা পরিশ্রম থাকে, সেটাকে আর কিছু ঘণ্টা সময় দিয়ে বানান এবং অন্যান্য বিষয় গুলো নিখুঁত করার চেষ্টা নেয়া যেতেই পারত। আশা করা যায় পরের মুদ্রণ গুলোতে এই সমস্যা থাকবে না।

কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও এক সময় এটা নিয়ে গ্রাফিক নভেল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সত্তরের দশকে হাতে আঁকার যে জটিলতা ছিল, সেটা যে পরিমাণে সময়-সাধ্য ছিল, সেটা চিন্তা করে তিনি শেষে পিছিয়ে আসেন। সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল গ্রাফিক ডিজাইন এবং ডিজিটাল আঁকিয়ে যন্ত্রের উদ্ভব অনেক কিছুই অনেক সহজ করে দিয়েছে।

তাই হয়ত তিনি এবারে রাজি হলেন তার এই গল্পগুলোকে মেহেদী হক এর তত্বাবধায়নে, রুমী ভাই এর নেতৃত্বে কমিক রূপ দিতে।

বাংলাদেশে এক সময় প্রচুর কমিক চলত, কিন্তু দুঃখের বিষয় ছিল সেটা ছিল ভারতীয় কমিক, বাংলাদেশের নিজস্ব কমিক ট্রেন্ড কেবল আহসান হাবীব এবং আরও দু একজনের হাত ধরে কোনমতে লাইফ সাপোর্ট এ টিকে ছিল।

সেখান থেকে সবকিছু যে কতখানি উন্নত হয়েছে, তা আসলেই আশার বাইরে ছিল। চিন্তাও করিনি কোনদিন, একটা প্রকাশনী বাংলাদেশে কেবল কমিক্স নিয়েই কাজ করবে, কমিক্স এবং গ্রাফিক নভেল প্রকাশ করে টিকে যাবে। সেটাই হয়েছে, আমরা আশা করতেই পারি শুধু ঢাকা কমিক্স নয়, আরও কয়েকটি কমিক্স ও গ্রাফিক নভেল প্রকাশনী তৈরি হবে, সেখানে মার্ভেল আর ডিসি কমিক্স এর মত ফাইট হবে, আর সেই প্রকাশনা প্রতিযোগিতা থেকে আমরা পেতে থাকব একের পর এক অসাধারণ সব কমিক্স।

সব দেশের সুপারহিরোরা কিন্তু এসেছে কমিক্স থেকেই। বাংলাদেশের সুপার হিরো ছিল না এই দুখে আমার মত যাদের সময় কাটছিল, তারা হয়ত এখন আমার মতই আশাবাদী হতে পারবেন…

জমি প্রস্তুত। ফসল বোনা হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সুপার হিরোরা আসলো বলে!

ধন্যবাদ ঢাকা কমিক্স। একটা আশা জাগিয়ে দেবার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *