বাসের ছাদে বাড়ি যাওয়া

একদা বাসের ছাদে বাড়ি যাওয়া

Blog, Travel , , ,

চারদিকে মনে হয় বিয়ের ধুম পড়েছে, তাই আবারও বিয়ে করতে রাতের বাসে রওনা দিলাম বগুড়া।

বিয়ে শনিবার দুপুরে। সকালে রওনা দিলেও চলত। কিন্তু বগুড়াবাসী সাকিব ভয় দেখাল আজকাল ঢাকা টু বগুড়া যেতে নাকি বারো চোদ্দ ঘন্টা লাগছে। মনে হয় রাস্তার দৈর্ঘ্য বেড়ে গেছে, ঢাকা বগুড়ার দুরত্বও বাড়া উচিত সে হিসেবে। তাতে বাংলাদেশের আয়তন বাড়ল কি না সেটা গবেষণার বিষয়।

কিন্তু সকল গুজবের মুখে ছাই দিয়ে সাড়ে পাচ ঘন্টায় বগুড়া পৌছে গেলাম। ভোর পাচটা। কেউ বিশ্বাসই করবে না বগুড়ায় এখন হু হু ঠান্ডা। কাপতে কাপতে একটা দই-মিষ্টির দোকানে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। এত সকালে দোকান কেন খুলেছে কে জানে, আবার বলাও যায় না,হয়ত বন্ধই করেনি সারারাত।

একটা চেয়ার টেনে বসে ভাবলাম, বগুড়া এসেছি, বিখ্যাত দই না খেলে কেমনে কি। খোজ নিয়ে মনে হল সেটা এবারে কপালে নেই। এক কেজির নিচে সাইজ নাই। এক কেজি দই নিয়ে উদাস চেহারায় বসে বসে খাচ্ছি, বিষয়টা জনসমাজে আলোরণ সৃষ্টি করতে পারে চিন্তা করে শেষে খাওয়ার আশা বাদ দিলাম।

বসে বসে ভোর রাতকে সকাল বানিয়ে চলে গেলাম সাকিবের বাড়ি। কারন সময় বেশি লাগবে এই গুজবটা তারই সৃষ্টি। এখণ যেহেতু লাগে নাই, তার বাড়িতেই হুজ্জত করা যাক। গিয়ে কোন কথা নাই, বিছানা বালিশ পেতে ঘুম। দশটায় ঘুম থেকে উঠে বিয়ের খবর নিতে গিয়ে দেখা গেল কপালটা আমার আসলেই খারাপ।

হিন্দু বিয়ে, লগ্ন নিয়ে ঝামেলা হয়ে বিয়ে হয়নি শেষে। বৌভাত কভার করার কথা ছিল, বিয়ে না হলে বৌ কেমনে হবে… ভাবলুম, হে খোদা! ইহাই ছিল তোমার ইচ্ছা। তবে তাই হোক। বাড়িতেই চলে যাই। সাকিবের ভাগ্না-ভাগ্নির ঝটপট কয়েকখানা ছবি তুলে সোজা তিন রাস্তা। ঢাকা থেকে আসা বাসগুলো ওদিক দিয়েই যায়।

বেশ কয়েকটা বাসওয়ালাকে রাজি করাতে না পেরে শেষে একজনকে পেলাম। নগদ একশত টাকার বিনিময়ে সে আমাকে বাসের ছাদে স্মাগল করে উঠিয়ে দিল।

বাসের ছাদে করে জার্নি জিনিসটা আরামের নয়। তবে মাথা ক্লিয়ার করার জন্য ভাল উপায়। শা শা করে বাতাস, ডানে বামে পুরাই খোলা, হাত পা ছড়িয়ে বসে বেশ একটা ভাব নিয়ে আসা যায়। চিন্তা ভাবনারও জন্যও বেশ ভাল জায়গা মনে হল কারণ গত বেশ কিছুদিন ধরে গবেষণা করছি, মানুষ দীর্ঘশ্বাস কেন ছাড়ে মনে কষ্ট পেলে, সেটার সমাধান হয়ে গেল। মনে কষ্ট পেলে মানুষ স্থবির হয়ে যায়, স্থির হয়ে যায়, এমনকি শ্বাস নিতেও মনে হয় ইচ্ছা করে না সে সময়। এভাবে বেশ কিছুটা সময় পরে শরীরে অক্সিজেনের অভাব শুরু হলে শরীর লম্বা একটা দম নিয়ে সেটা পুরণ করে।

বাহ! দুর্দান্ত বাতাসের তোড়ে হয়ত আমার বুদ্ধি খুলে গেল! বেশি অক্সিজেনের প্রভাব কি না গবেষকরা বলতে পারবেন!

খানিক পরে দেখি এক বুড়ো চাচা চলে এসেছে ছাদে। সে বেশ আরাম করে বস্তা দিয়ে বানানো ব্যাগ গুছিয়ে ছাদেই বিছানা করে ঘুমাবার পরিকল্পনা করছে মনে হয়। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি।

বাস এমনই টান দিয়েছে, ডানে বামে দুলিয়ে দুলিয়ে শা শা করে চলছে, যে বুড়োর আরামের ঘুম শেষ। বিরক্ত হয়ে ফোকলা দাতে সে অনুযোগ জানাল, নাবিল বাসটা খুব খারাপ। এত জোরে চালায়, ঘুমানো যায় না।

তাকে বিস্কুট অফার করলাম। সে কিছুক্ষন সন্দেহপ্রবণ চেহারায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। ভাবছে হয়ত আমি অজ্ঞান পার্টি কি না, তাকে বেহুশ করে তার বস্তা নিয়ে হাওয়া হয়ে যাব কি না। কি ভেবে বিস্কুটের প্যাকেটটা নিল, তারপরে সুন্দর করে তার ব্যাগের ভেতরে রেখে দিয়ে উদাস চেহারায় চারপাশের প্রকৃতি দেখতে লাগল।

জোকসটা মনে পড়ল, অজ্ঞান পার্টি যদি কিছু দেয়, সেটা রেখে দিন। বাসায় গিয়ে যেদিন ঘুমের সমস্যা হবে, সেদিন খেয়ে নেবেন। বুড়ো হয়ত তাই ভেবেছে। বাড়িতে গিয়ে খাবে।

খানিকপরে বাসের ছাদে ভ্রমণের আরও একটা উপকারিতা আবিস্কার করলাম। বাতাসে কানে কিছু শোনা যায় না প্রায়। তাই এখানে গলা খুলে গান করলেও মাইন্ড করার কেউ নেই। ভাবলাম এবারে তাহলে সঙ্গীত চর্চা শুরু করা যাক। আর শুনলে তো বুড়োই শুনবে, তাকে বিস্কুট দিয়েছি, তার বিনিময়ে কম সে কম গান তো সে শুনতেই পারে। আইয়ুব বাচ্চু দিয়ে শুরু, আনুশেহ, অর্ণব, তাহসান, আংরেজি, বাদ গেল না কোন শিশু।

খেয়াল হতে দেখি বুড়ো সরে গিয়ে বাসের ওওওই মাথায় গিয়ে বসেছে। হায়… এই জিনিস দেখি তারও সহ্য হয় নাই।

পীরগঞ্জ এলাকায় বাস থামতে এক ফেরিওয়ালার সাথে ইশারায় কথা চালিয়ে চার প্যাকেট সল্টেড বাদাম কিনলাম। বুড়ো দেখি বলছে, এক প্যাকেট তাকে দিতে। ভাবলাম একবার, বলি, চাচা গো! এটাতেও ওষুধ দেয়া আছে। আমারও রাতে ঘুমাতে সমস্যা হয় কি না!

তারপরে ভাবলাম, থাক। হতেই পারে আমার চেয়ে এই লোকের ঘুম কম হয়। বুড়ো হলে নাকি ঘুম কমে যায়। ঘুমের ওষুধ তারই তো বেশি দরকার। তাকে একটা প্যাকেট হস্তান্তর করে দিয়ে আবার গান ধরলাম। ব্রায়ান এডাসম, বন জোভি, রিচার্ড মার্কস, ক্রিড এবং আরও কিছু হাবিজাবি।

খানিকপরে শঠিবাড়ি আসতে বুড়ো নেমেই গেল। তার ঠিকানা এটা নাকি সে গেল আমার গানের জোরে, কে বলতে পারে!

রাস্তার ধারে আসতে আসতে বেশ অনেক গুলো ইটের ভাটা দেখলাম। গল গল করে ধোয়া ছাড়ছে, গাছপালা পুড়িয়ে ইট বানাচ্ছে। মানুষ যে পিল পিল করে বাড়ছে, সেটার একটা প্রমান হতে পারে এটা। ইট দিয়ে বাড়ি হবে, কারখানা হবে, ক্ষেত খামারের জমি গায়েব হয়ে যাবে, ফসল কমে যাবে, এক সময় না খেয়ে বাড়তি মানুষেরা মারা যাবে। পৃথিবী আবারও ফাকা হয়ে যাবে। এটাই হয়ত আছে কপালে।

দেশ ও জাতির ভবিষ্যত ভাবতে ভাবতে চলে এলাম মডার্ণের মোড়, তারও মিনিট সাতেক বাদে রংপুর টার্মিনাল। তারপরে বাড়ি।

পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক। তাহারাও আমার মত নিরাপদে বাড়ি ফিরুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *